বাংলাদেশরাজনীতি

সর্বজন শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আ ন ম শফিকুল হক-এর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আজ সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বর্ষীয়ান রাজনীতিবীদ আ ন ম শফিকুল হক-এর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী॥২০১৯ সালের ১৪ আগষ্ট মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
রাজনীতির সঙ্গে আ ন ম শফিকুল হকের সখ্য ছাত্রজীবন থেকেই। ১৯৬৫ সালে এমসি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পরই নাম লেখান ছাত্রলীগে। তখন বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্রের জন্মের প্রেক্ষাপট হিসেবে পাকিস্তানের পশ্চিম অংশের সঙ্গে পূর্ব অংশের দূরত্ব বাড়ছিলো। লেখাপড়া-রাজনীতি দুটোই চলছিলো সমানতালে। ছয় দফা আন্দোলনের সময়ে তিনিও ছিলেন রাজনীতির মাঠে। ছিলেন স্বাধিকারের সকল আন্দোলনেই। হঠাৎ পরিবারে অসচ্ছলতা দেখা দিলে মাঝপথে পড়ালেখায় বিরতি ঘটে বিশ্বনাথ আওয়ামী লীগের কনিষ্ঠতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আ ন ম শফিকের। সংসারের চাকা গতিশীল রাখতে বাবার মতোই যুক্ত হন শিক্ষকতায়। বাবা মৌলভী তবারক আলী তখন সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দশপাইকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আর ছেলে শিক্ষক হিসেবে নাম লেখান পার্শ্ববর্তী মৌলভীগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শিক্ষক হিসেবে নতুন জীবন শুরু হয় আ ন ম শফিকের। পাশাপাশি রাজনীতির মাঠেও সরব ছিলেন। সময়টা ১৯৬৯ সাল। দেশজুড়ে এক উত্তাল সময় তখন। ‘মাস্টার সাব’ আ ন ম শফিকও ব্যস্ত অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। নিজের ও আশেপাশের গ্রামে তখন মাস্টার সাব’ই যেনো মুখপাত্র। তাকে পথে থামিয়ে সবাই দেশের খবরাখবর জানতে চান।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরোটাই যুদ্ধের মাঠে কাটিয়েছেন আ ন ম শফিকুল হক। ৫ নং সেক্টরে থেকে সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তবে অস্ত্র হাতে নেননি। নিজে যে সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা নন সেটা স্পষ্টই সংবাদকর্মীদের কাছে স্বীকার করেন আ ন ম শফিক। বললেন, চাইলেই সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সার্টিফিকেট যোগাড় করে নিতে পারতাম। কিন্তু মিথ্যের প্রলেপ দিয়ে সত্যের মহিমাকে কালিমালিপ্ত করতে চাইনি আমি। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতারা তাকে শহরে টেনে নিতে চাইলেন। নূরুল ইসলাম খান, শাহ মোদাব্বির আলী প্রায়ই তাকে বলতেন সিলেট শহরে এসে স্থায়ী হতে। কিন্তু তিনি গ্রামের মায়া, গ্রামের মানুষের মায়া কাটিয়ে শহরমুখী হতে পারেননি তখন। গ্রামের প্রতি এ ভালোবাসার প্রতিদান পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়নি। স্বাধীনতার পরপরই বিশ্বনাথের ৫ নং দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনোনীত হন। মানুষের আরো কাছাকাছি আসার সুযোগ হয় তার। সাধারণের জন্য আরো বেশি কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন তিনি।

১৯৭৭ সালে সিলেট শহরে ঠিকানা গড়েন আ ন ম শফিকুল হক। অ্যাডভোকেট আবদুর রহীম, ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চলসহ স্থানীয় নেতাদের বারবার তাগাদার ফলেই জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অভিষিক্ত হন আ ন ম শফিকুল হক। ১৯৭৭ সালে নতুন করে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন হলে সিলেট আওয়ামী লীগের কমিটিতে সদস্য হিসেবে টেনে নেয়া হয় আ ন ম শফিককে। সিলেটে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যাঁরা নিবেদিতপ্রাণ বলে পরিচিত ছিলেন, দলের দুর্দিনে যাঁরা ত্যাগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন তাদের মধ্যে আ ন ম শফিকুল হক অন্যতম। কারন অতীত ঘেঁটে দেখা গেছে সিলেট আওয়ামী লীগের অধিকাংশ কমিটিই সম্মেলনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। আর সেসব সম্মেলনের মাধ্যমেই সিলেটে থেকে উঠে এসেছেন অনেক জাতীয় নেতা,১৯৮৬ সালে পরের সম্মেলনে সভাপতি অপরিবর্তিত আর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আসেন আবু নসর মোহাম্মদ (আ ন ম) শফিকুল হক। এরই মাঝে সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুর রহিমের মৃত্যু হলে সিনিয়র সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আবু নসর ভার পান সভাপতির। ৯১ ও ৯৭ সালের সম্মেলনেও শীর্ষ পদে পুরনোরাই বহাল থাকেন। ১৬ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলানোর পর ২০০২ সালের সম্মেলনে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পান আ ন ম শফিক। পরবর্তীতে আনম শফিকুল হককে আওয়ামী লীগের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে অর্ন্তভূক্ত করা হয়।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য আ.ন.ম. শফিকুল হক। ১০ বছর সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ১৬ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে পা রাখেন। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জনমত সংগঠনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে একজন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর নিখোঁজ হওয়া ছোট ভাই এখনো ঘরে ফিরেননি। মুক্তিযুদ্ধে হারিয়েছেন খালাতো ভাই ও মামাতো ভাইকে। সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও রাজনীতি থেকে এক পাও পিছু হটেননি প্রবীণ আওয়ামী লীগের এই নেতা। সিলেটের পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে যাদের সুনাম রয়েছে, তিনি তাদের অন্যতম একজন। এককালে সাংবাদিকতাও করেছেন। ষাটের দশকে সাপ্তাহিক বাংলার বাণী পত্রিকায়, ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে সাপ্তাহিক খবর ও দৈনিক খবরে সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে কাজ করেছেন।
১৯৭৫ সালের পর প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। খন্দকার মোশতাক, জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল এরশাদ এবং খালেদা জিয়ার অপশাসনবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ২০০৬ সালে ১/১১ এর সময় কৌশলে সেনাসমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ার পাশাপাশি আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৯৭৫ সালের কালরাতের পরবর্তী সময়ে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তবে নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়। ১৯৮৭ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলন করার কারণে দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন।এরপর ২০০০ সালে জাতিসংঘ মিলেনিয়াম শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা ও সাধারন পরিষদে যোগদান করেন তিনি।এছাড়া ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন,২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্যে সংসদ উপমহাদেশের প্রাচীনতম সাহিত্য সংগঠন তাতে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সভাপতি নির্বাচিত হন(২০১৯-২০২০)
রাজনীতির জন্য জীবনের পুরোটাই বিলিয়ে দিয়েছেন তিনি। স্বচ্ছ ব্যক্তি ইমেজ নিয়ে দিনরাত শ্রম দিয়ে সংগঠনকে শক্ত একটি অবস্থানে এনেছেন। তাঁর হাতে সৃষ্টি হয়েছে হাজারো নেতা কর্মী।আ ন ম শফিকুল হক মাটি ও মানুষের নেতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার চেতনা নিয়ে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। শিক্ষকতা দিয়ে পেশা জীবন শুরু করেছিলেন সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের মৌলভীরগাঁওর আ ন ম শফিকুল হক। ছাত্রলীগ দিয়েই তার শুরু হয়েছিল রাজনীতিরপাঠ। তাই বেশিদিন আর শিক্ষকতা করা হয়নি। রাজনীতিতেই পুরোটা সঁপে দেন নিজেকে। সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সম্পাদকীয় পদে দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও তিনি জেলা আওয়ামী লীগের দুইবারের সাধারণ সম্পাদক ও দুইবারের সভাপতি ছিলেন। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দু:সময়ে সিলেটে তিনি ছিলেন দু:সাহসী কান্ডারী। সর্বশেষ তিনি আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্যও ছিলেন তিনি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সার রোগে ভুগছিলেন। ২০১৫ সালে তিনি ভারতের মেডেনটা হাসপাতালে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করিয়েছিলেন,২০১৯ সালে ১৪ই আগষ্ট বিকেল সাড়ে তিন টার দিকে সিলেটে একটি বেসরকারি হাসপাতাল আল হারামাইনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন।

Show More

Related Articles

Back to top button
Close
Close