বাংলাদেশরাজনীতি

সিলেট আওয়ামী লীগের চার রত্ন

রুবা তানজিদা হক,লেখক/কলামিস্ট:ছবিতে জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সিলেটের আওয়ামী রাজনীতির চার খলিফা খ্যাত শফিক-শামীম ও কামরান-মিসবাহ। বিগত তিন দশক ধরে যাহারা অত্যন্ত সুনামের সাথে সিলেটের আওয়ামী লীগকে পরিচালনা করেছেন। যাদের বিচক্ষণতা দুরদর্শিতা বৃহত্তর সিলেট জেলা আওয়ামীলীগ দুর্গে পরিনত হয়েছিল, ২০০১ সালের অক্টোবর মাসের এক তারিখ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের কাছে হেরে যায় আওয়ামী লীগ,শুরু থেকে ওই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ,আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়,২০০১ সালের নির্বাচনের পর সিলেটের এই চার নেতা জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাত করেন। চার নেতা হলেন মরহুম আ ন ম শফিকুল হক,মরহুম ইফতেখার হোসেন শামীম মরহুম বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। ২০০১ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের পরাজয় ও সিলেটের সার্বিক পরিস্থিতি জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরেন চার নেতা। জননেত্রী এই চার নেতাকে সিলেটের চার খলিফা আখ্যা দিয়ে সিলেটে দলকে সুসংগঠিত করার নির্দেশনা দেন।চার খলিফার মধ্যে থেকে তিন খলিফা পরলোক গমন করেন তারা তিন খলিফা হলেন আ ন ম শফিকুল হক, ইফতেখার হোসেন শামীম ও বদর উদ্দিন আহমদ কামরান।

সিলেট আওয়ামী লীগের চার রত্ন
ছবি:আ ন ম শফিকুল হক

আ ন ম শফিকুল হক মাস্টার সাব’ ও সাংবাদিক থেকে দক্ষ রাজনীতিবিদ আ. ন. ম শফিক হয়ে উঠেন সিলেট আওয়ামী লীগের রাজনীতির এক বটবৃক্ষ। ১৯৬৫ সালে এমসি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পরই তিনি ছাত্রলীগে নাম লেখান। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জনমত সংগঠনে কাজ করেন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে ৫ নম্বর সেক্টরে তখনকার জাতীয় পরিষদ সদস্য আব্দু হকের সাথে কাজ করেছেন।১৯৭৫ সালে সকল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করেন তিনি। এ সময়ে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরে নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়।  ১৯৭৭ সালে নতুন করে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন হলে এ কমিটিতে নিজের শ্রমের জন্য স্থান পান সিলেট আওয়ামী লীগের কমিটিতে সদস্য হিসেবে টেনে নেয়া হয় আ ন ম শফিককে। ১৯৮৬ সালের পরের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আসেন আ.ন.ম শফিকুল হক।এ ছাড়া ১৯৮৭ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলন করার কারণে ৫ মাস কারান্তরীন ছিলেন। তাকে ওই সময় অনেক লোভনীয় পদের প্রলোভন দেখানো হলেও তিনি আদর্শচ্যুত হন নি।এছাড়া খন্দকার মোশতাক, জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল এরশাদ এবং খালেদা জিয়ার শাসনামলে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং অনেক জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ১৬ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলানোর পর ২০০২ সালের সম্মেলনে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পান আ.ন.ম শফিক।২০০৬ সালে ১/১১ এর সময় কৌশলে সেনাসমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ার পাশাপাশি আন্দোলন চালিয়ে গেছেন
এরপর ২০০০ সালে জাতিসংঘ মিলেনিয়াম শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা ও সাধারন পরিষদে যোগদান করেন তিনি।এছাড়া ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন,২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্যে সংসদ উপমহাদেশের প্রাচীনতম সাহিত্য সংগঠন তাতে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সভাপতি নির্বাচিত হন(২০১৯-২০২০)।

রাজনীতির জন্য জীবনের পুরোটাই বিলিয়ে দিয়েছেন তিনি। স্বচ্ছ ব্যক্তি ইমেজ নিয়ে দিনরাত শ্রম দিয়ে সংগঠনকে শক্ত একটি অবস্থানে এনেছেন। তাঁর হাতে সৃষ্টি হয়েছে হাজারো নেতা কর্মী।আ ন ম শফিকুল হক মাটি ও মানুষের নেতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার চেতনা নিয়ে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। শিক্ষকতা দিয়ে পেশা জীবন শুরু করেছিলেন সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের মৌলভীরগাঁওর আ ন ম শফিকুল হক। ছাত্রলীগ দিয়েই তার শুরু হয়েছিল রাজনীতিরপাঠ। তাই বেশিদিন আর শিক্ষকতা করা হয়নি। রাজনীতিতেই পুরোটা সঁপে দেন নিজেকে। সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সম্পাদকীয় পদে দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও তিনি জেলা আওয়ামী লীগের দুইবারের সাধারণ সম্পাদক ও দুইবারের সভাপতি ছিলেন। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দু:সময়ে সিলেটে তিনি ছিলেন দু:সাহসী কান্ডারী। সর্বশেষ তিনি আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। জেলা আওয়ামী লীগের বকমিটির কার্যনির্বাহী সদস্যও ছিলেন তিনি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সার রোগে ভুগছিলেন। এছাড়াও তিনি ভারতে গিয়ে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করিয়েছিলেন,২০১৯ সালে ১৪ই আগষ্ট বিকেল সাড়ে তিন টার দিকে বেসরকারি হাসপাতাল আল হারামাইনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের কারণবশত মৃত্যুবরণ করেন।

সিলেট আওয়ামী লীগের চার রত্ন
ছবি:ইফতেখার হোসেন শামীম

ছাত্র থাকার সময়েই রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে ইফতেখার শামীমের। ৬৬ এর ৬ দফা দাবি, ৬৯ এর গণঅভ্যুথান, ৭১ এর সমকালীন রাজনীতিতে তার যুগপথ আন্দোলন ইফতেখার শামীম ৭১-এর মুক্তিসংগ্রামে যোগ দেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে ২ নং সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ করেন তিনি। ছিলেন কোম্পানি কমান্ডার। ৮০ দশকে জেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। এরপর ১১ বছর  জেলা আওয়ামী লীগের জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন।সিলেটে আওয়ামী লীগের রাজনীতির দিকপাল হিসেবে তখন থেকে তার ভূমিকা সবার দৃষ্টি কাড়েন

২০০২ সালে দলীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে সিলেট আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি হন ইফতেখার শামীম। সিলেট আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি দায়িত্ব পালন করছেন। একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ও দক্ষ সংগঠক ছিলেন। তিনি আজীবন দেশপ্রেমকে বুকে লালন করে মহান মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছিলেন একজন অগ্রসৈনিক। সিলেটের রাজনীতিতে ইফতেখার হোসেন শামীম ছিলেন একজন ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা ইফতেখার হোসেন শামীম ২০১২ সালের ১১ মে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। সে সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা শামীম সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ছিলেন।

সিলেট আওয়ামী লীগের চার রত্ন
ছবি: বদর উদ্দিন আহমদ কামরান

সিলেটের রাজনীতিতে সবচেয়ে পরিচিত মুখ বদর উদ্দিন আহমদ কামরান।শুরুটা হয়েছিল সিলেট পৌরসভার ওয়ার্ড কমিশনার হিসেবে।এরপর পৌরসভার চেয়ারম্যান। সিলেট যখন শহর থেকে মহানগর হল, তাকেই মানুষ বেছে নিয়েছিল সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র হিসেবে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে সর্ব কনিষ্ঠ জনপ্রতিনিধি কাউন্সিলার হিসেবে সিলেটের ৩ নং ওয়ার্ডে নির্বাচিত হন,১৫ বছর পৌর কমিশনার হিসেবে কাজ করেন,তাছাড়া ১৯৮৯ সাল থেকে সিলেট শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান,১৯৯৫ সালে তিনি সিলেট পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০০২ সালে সিলেট পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর কামরান মেয়র মনোনীত হন।২০০২ সালে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হন কামরান।সেই দায়িত্ব তিনি সামলেছেন প্রায় দেড় যুগ,২০০৭-০৮ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুই দফা গ্রেপ্তার হয়ে ১৮ মাস কারাবন্দি ছিলেন কামরান। সে সময় আওয়ামী লীগ নেতা কারাগারে থেকে নির্বাচন করেও বিপুল ভোটে জয়ী হন।

২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে হেরে গিয়ে মেয়র পদ হারান কামরান। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি লড়েছিলেন, কিন্তু জয়ী হতে পারেননি,২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য পদ পাওয়া কামরান বর্তমান কমিটিতেও একই পদে ছিলেন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা কামরান এই পুরো যাত্রাপথে মানুষের সঙ্গেই ছিলেন।করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার ১৫ ই জুন ভোরে মারা যান সিলেটের সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। তার বয়স হয়েছিলো ৬৯ বছর।

সিলেট আওয়ামী লীগের চার রত্ন
ছবি:মিছবাহ উদ্দিন সিরাজ

আওয়ামী লীগের টানা তিনবারের সফল সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। ’৭০র দশক থেকে আওয়ামী ঘরানার রাজনীতির সাথে জড়িয়ে আছেন মিসবাহ সিরাজ। ওই সময়ে মদন মোহন কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন তিনি। ১৯৮১ সালে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।১৯৮৩ সালে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নির্বাহী সদস্যও ছিলেন। ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন মিসবাহ সিরাজ। ২০০২ সালে তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি তার অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন।২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের ১৮তম জাতীয় সম্মেলনে তাকে দলটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। এরপর ২০১২ সালে ১৯তম জাতীয় সম্মেলন এবং ২০১৬ সালে ২০তম জাতীয় সম্মেলনেও একই পদে দায়িত্ব পান মিসবাহ সিরাজ,তিনি তার উপর অর্পিত দ্বায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জন নেত্রী শেখ হাসিনার শ্রেষ্ঠ আবিস্কার সিলেট আওয়ামী লীগের চার রত্ন থেকে তিন রত্ন না ফেরার দেশে চলে গেছেন,যারা জীবদ্দশায় দেশ এবং দলের জন্য জনকল্যাণমুখী কাজ নিঃস্বার্থভাবে করে গেছেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের এই অভাবনীয় ক্ষতি অপূরনীয়,তাদেরকে সবাই শ্রদ্ধার সহিত আজীবন স্মরণ রাখবেন হৃদয়ের মনির কোঠায় থাকবেন অনন্ত কাল।

প্রবীণ নেতৃত্ব এক সময় থাকবে না, তখন তরুণ প্রজন্মকেই দেশ ও সমাজের হাল ধরতে হবে।বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন- তরুণ প্রজন্মের অবিস্মরণীয় ভূমিকা ছিলো,সঠিক রাজনীতির জন্য চাই দক্ষ, প্রশিক্ষিত, শিক্ষিত, সৃজনশীল , বলিষ্ঠ ও স্বচ্ছ নেতৃত্ব,নতুন প্রজন্মকে বলয়ের রাজনীতি থেকে বের হয়ে নিরপেক্ষ রাজনীতির অবস্থান সমাজে মজবুত করার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভুমিকা রাখতে হবে,রাজনীতি শুধু একটি দলের নয় গোটা দেশ এবং সমাজ পট পরিবর্তনে অনস্বীকার্য অবদান রাখে।

Show More

Related Articles

Back to top button
Close
Close