মুক্তমঞ্চ

শিল্পীর জীবনযাত্রা!

বাবুল রহমান :শিল্পী ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো রাজিবকে।শিল্পীর পরিবারের আপত্তি ছিলো কিন্তু সে নাছোড়বান্দা অনার্স ফাইনালের আগে লেখাপড়ার সুযোগ কেড়ে নিলেন বাবা মা,যে সুযোগে তার মন দেয়া নেয়া সেটি বন্ধ করতে কড়া নজরদারিতে গৃহবন্ধি।যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হওয়াতে খাওয়া দাওয়া ও নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটে।আস্তে আস্তে শিল্পীর চোঁখের নীচে কালো দাগ পড়তে লাগলো।বাবা মা ও বেশ রিলাক্স মেয়েকে বন্দি করে তবে শিল্পী বসে নেই নানা ফন্দিফিকির করতে থাকে অবশেষে একদিন ভোরের আলো প্রজ্জ্বলন হতেই কাউকে কিছু না বলে উধাও।

শিল্পীরা দুই ভাই ও দুই বোন,সে সবার বড়।শিল্পী প্রেমিকের হাত ধরে কোর্টের মাধ্যমে বিয়ের কাজটি সম্পাদন করে। যদিও শশুড়বাড়ির মানুষ সব মেনে নিয়েছে তবু কোর্টের মাধ্যমে করার একমাত্র কারণ ছিলো শিল্পীর পরিবার যেন কোন মামলা করে তাদেরকে হেনস্ত না করে।শশুড় মোহরানা হিসেবে নিজের সম্পত্তি দুইছেলের মধ্যে ভাগ করে ছেলের অংশে পাওয়া দিলেন পুত্রবধুকে।সাদরে গ্রহণ করে নেন নুতন মানুষটাকে আপন করে এবং বৌভাতের মত ছোট্ট অনুষ্ঠান করে নিলেন যাতে করে শিল্পীর মনে কষ্ট না হয় এবং নতুন বৌয়ের সাজে সাঁজিয়ে নেন।শিল্পী মহাখুশী এবং শশুড় শাশুড়িও নিজের বাবা মা’য়ের মত আদর সোহাগ করতে লাগলেন এতে কোন কার্পণ্য ছিলোনা কিন্তু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া তাকে আস্তে আস্তে পীড়া দিতে শুরু করে।

কিছুদিন না যেতেই শিল্পী টের পেলো পেটের মধ্যে নতুন মানুষের আগমন এবং সেই থেকে কেমন জানি বাবা মা’য়ের জন্য মনটা ব্যাকুল।হয়তো মা’য়ের কষ্টের কথা মনে করে অস্হিরতা বাড়তে থাকে।নিজের সন্তানের কথা চিন্তা করে মনকে সামলাতে শুরু করে। এদিকে ভালোবাসার মানুষটির চরিত্রের অনেক কিছু সামনে চলে আসে,প্রতিরাত মদ্যপ অবস্হাতে বাড়ি ফিরে তাকে গালাগালসহ শারীরিক নির্যাতন করতে থাকে।মাঝেমধ্যে রাতে ঘরে ফেরেনা,নষ্ট মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করতে থাকে।জ্বালা যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ হলেও মুখ বুজে সইতে হচ্ছে ভালোবাসার অপরাধে,নিজেকে প্রশ্ন করে ভালোবাসা কি অপবিত্র.!প্রতিবারই মনকে শান্তনা দেয় ভালোবাসা পবিত্র কিন্তু নিজের বাছাই কাজটি ছিলো ভুল,নিজের সিদ্ধান্ত ছিলো অন্যায় এবং খেসারত দিতে হবে হয়তো আজীবন তবে আর সহ্য হচ্ছেনা,বাবা মা’য়ের করুণা পেতেই হবে।

মনকে স্হির করলো বাচ্চা হওয়ার পর বাবা মাকে দেখাতে যাবে সেইসাথে কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে তাদের মনকে জয় করে বাচঁতে হবে।সাত মাস চলছে কিন্তু সময় যেন কমে আসছেনা কখন যে বাচ্চা জন্ম দেবে আর পরিবারের ছায়াতলে মনটাকে শান্ত করবে।এভাবে দিন গুনতে গুনতে দশমাস হলে খুশিতে আত্বহারা আর মাত্র কদিন।

চারদিন পর হাসপাতালে ভর্তি হলে ডাক্তার জানিয়ে দিলো নরমাল বাচ্চা হবে যদি কোন সমস্যা না হয়।এরপরের দিন সন্ধ্যা বেলা ফুটফুটে এক পুত্র সন্তানের মা হোন শিল্পী আর সেইদিনই সকালের ফ্লাইটে ওর বাবা মা ভাইবোনসহ স্বপরিবারে আমেরিকাতে স্হায়ীভাবে বসবাসের জন্য দেশ ত্যাগ করেন।শিল্পীর দূর্সম্পর্কের এক মামাতো বোন তার এক আত্বীয়কে হাসপাতালে দেখতে আসে,পাশের বেডেই শিল্পী ও তার নবজাতক,আলাপের এক পর্যায়ে বাবা মা’য়ের আমেরিকা গমণের সংবাদটি দেয়।
সংবাদ শুনে আকাশ ভেঁঙ্গে পড়ে মাথায়,হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে,বাঁধ ভাঙ্গা অশ্রুতে ভেসে যায় দুগাল।অনেকদিন বাবা মাকে না দেখা তার উপর অভিশপ্ত জীবনের সমাধান কেমনে হবে ভেবে দিশেহারা।আজকের এই আনন্দের দিনটা অন্ধকারে ছেয়ে গেছে মনে হতে লাগলো,বেঁচে থাকার সব স্বাদ যেন ধুলোয় মিশে গেলো।তবুও বাঁচতে হবে সন্তানের জন্য অসহায় হৃদয়কে কোনভাবে সামলাতে পারছেনা।
রাত দশটার দিকে এক পর্যায়ে জ্ঞান হারায় ফেললে সাথে সাথে কর্তব্যরত ডাক্তার অক্সিজেন দিতে শুরু করে,অবস্হার অবনতি হতে থাকলে স্বামীকে খবর দেয়া হয় এবং দ্রুত লাইফ সাপোর্টে স্হানান্তরিত করা হয়।স্বামীসহ শশুড় শাশুড়ি আসে হাসপাতালে কিন্তু দুঘণ্টা পর স্বামী হাসপাতাল ত্যাগ করলেও শশুড় শাশুড়ি মাথার পাশেই থাকলেন জ্ঞান না আসা পর্যন্ত।তিনদিন পর ফিরে এলো স্বাভাবিক জীবনে,এ যেন নতুন জীবন পেলো বাচ্চার জন্য।
ঘরে ফিরে এসে বাচ্চার দিকে তাকিয়ে অস্হির মনটাকে শান্তনা দিলো তাকে বাচঁতে হবে শুধু পেটের সন্তানের জন্য।ধীরে ধীরে মন থেকে সব ঝেড়ে বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হতে লাগলো,কিভাবে বাচ্চা বড় হবে ওর ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করতে করতে এক সময় বাবা মার মলিন মুখটা স্মৃতির পাতায় লিপিবদ্ধ হলো।সংসারের ফাঁকে ফাঁকে অন্য দশটা মেয়ের মত ভাইবোন বা পরিবারের কথা ভাবে,আগের মত আর কষ্ট পায়না বাচ্চা নিয়েই ব্যস্ত।
পারিবারিক অশান্তি বাড়তেই লাগলো কি আর করা,স্বামী খুব একটা ঘরে আসেনা,আসলেও মদ্যম অবস্হায় থাকে,কোন কিছুর খবর নেই।কিছুদিন না যেতেই শিল্পী আবারো প্রেগন্যান্ট,তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে সবই চলছে,শিল্পী সুস্হ না অসুস্হ রাজিব জানতে চায়না,বাঁধা দিলে শারীরিক নির্যাতন চলে আসে।শিল্পী গোসলে গেলে শরীরের দাগ দেখে কাঁদে আর ভালোবাসার হারামীটার প্রতি ঘৃণা করে।ভালোবাসাতো পেলোই না বরং অত্যাচারে অতিষ্ঠ।মাঝে মাঝে চিন্তা করে এটাই কি ভালোবাসার প্রতিদান.!

যাইহোক শিল্পী দ্বিতীয়বারও পুত্র সন্তান জন্ম দেয় এবং আস্তে আস্তে দুজন বড় হতে থাকে।স্কুলে ভর্তি হলো দুজনই এবং তাদের লেখাপড়া স্কুলে যাওয়া আসা করেই দিন চলছে,সব যেন স্বাভাবিক।
বাবা মার স্মৃতিটাও যেন স্মৃতিশক্তি থেকে মুছে যেতে লাগলো,খুব একটা মনে পড়ে না আজকাল।শশুড় শাশুড়ির আদর যত্ন বাবা মার চেয়ে বেশী মনে হতে লাগলো।রাজিবের দূর্ব্যবহারে বাবা মাও লজ্জিত তাই অতি আদরে বৌমা ও নাতীদের দেখভাল করতেন।সেও ব্যস্ত পরিবার নিয়ে আর অত্যাচার নির্যাতন মদ্যপ অবস্হা সবই গায়েমাখা হয়ে গেলো।কোন কিছুই স্মরণ করে আফসোস করার সময় নেই শিল্পীর হাতে।ইতিমধ্যেই বাচ্চাদের স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে চাকুরী পেলো।ভালোই চলছে তার বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলে যায়,এসে রান্না করে বাচ্চাদের পড়াতে বসে।এভাবেই বছর যায় ছেলেরা বড় হতে থাকে,লেখাপড়াতে বেশ ভালো বড়ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে আর ছোটটা পঞ্চম শ্রেণীতে।

একদিন ছুটির দিনে দুপুর বেলা রাজিব ঘরে আসতেই শিল্পীর মাথায় চিন্তা আসলো এই অসময়ে কেন.!সে তো সাধারনত মাস পনেরো দিন পর মধ্যরাতে হাজির হয় তবে হাতে আজ এক গুচ্ছ রজনীগন্ধা ও কিছু প্যাকেট। রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই শিল্পী ভয়ে কাতর কিন্তু নাহ্ এসব কিছুনা।শিল্পীকে জড়ায়ে ধরে অনেক কাঁন্নাকাটি করে ক্ষমা চাইতে লাগলো,অনুনয় বিনয় করতে লাগলো তার সারাজীবনের ভুলের জন্য,হাতপা ছাড়ছেনা।শিল্পীও বুঝতে পারলো এটা কোন অভিনয় নয়,সত্যি কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত লজ্জিত।মূহুর্তে সব ভুলে গেলো তার ভালোবাসার মানুষকে ফেরত পেয়ে,পরম তৃপ্তিতে কাটবে বাকিটা জীবন,স্বপ্নে ভরপুর সুখের সংসারটা সাঁজাবে নতুন করে।শিল্পীও বুঁকে জড়িয়ে সুখ দিলো রাজিবকে,এ যেন এক নতুন জীবন।প্যাকেট থেকে লাল রংয়ের শাড়িটা ধরিয়ে দিয়ে বলে পরে নাও এখন,রজনীগন্ধা হাতে তুলে দিয়ে একটি ছিঁড়ে খোঁপায় বেঁধে দিলো।শিল্পীর জীবনে যেন এক বিশাল পাওয়া।দুপুরে খাওয়া একসাথে সে অনেকদিন পরে,কখন যে একসাথে বসেছিলো খেতে শিল্পীর মনে নেই।বিকেলটাও সুন্দর কাটলো চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দুজন মুখোমুখি বসে।পরেরদিন রাতে একটু বাহিরে খাবে বলে ছেলেসহ রেষ্টুরেন্টে গেলো,সে কি আনন্দ শিল্পীর,হাতেহাত রেখে গল্প চলছে বেশ প্রানবন্ত।সুখের সাগরে চলছে জীবনতরী,ভালোবাসায় আজ ধন্য।

শপিং সেন্টারে এখানে ওখানে প্রায় খেতে যায় তবে শশুড় শাশুড়ির কথা ভুলেনি,পার্সেল নিয়ে আসে শিল্পী।দুমাস পরে রাজিব বলে শিল্পী তুমি অনেক কষ্ট করেছো আমার জন্য তোমাকে কিছু দেইনি তবে আমার ইচ্ছে একখন্ড জমি কিনে দিবো,জমিটাও দেখে রেখেছি আগামী বুধবার রেজিষ্ট্রী করবো কোর্টে,স্কুল থেকে ছুটি নিও।

বুধবার সকালে তৃপ্তির স্বাদ নিয়ে ঘুম ভাঙ্গে শিল্পীর,সুন্দর কাপড় পরে রাজিবের সাথে রেজিষ্ট্রী কাজ শেষ করে নামিদামি রেস্টুরেন্টে খেয়ে বিকেলে ঘরে ফিরে এসেই জল্পনা কল্পনা শুরু হয় কি রকমের বাড়িটি হবে তাদের।বর্তমানে ভাড়া বাড়িতে থাকে ওরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বানানো যাবে ততই ভালো।

ইন্জিনিয়ারে কাছে গিয়ে ড্রয়িং করতে রাজিবকে বলে এবং সেও সম্মতি দেয়। শিল্পীর হাতেও জমানো কিছু টাকা আছে সব মিলিয়ে বাড়িটা সম্পন্ন করা সম্ভব। শিল্পী তার কলিগের পরিচিত ইন্জিনিয়ারের সাথে তারিখ নিলো আগামী রোববার সন্ধ্যার পর যাবে।

রোববার সকালে রাজিব বৌ বাচ্চাদেরকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে যাবার সময় শিল্পী বলে বিকেলের মধ্যে চলে এসো,মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে চলে যায়। শিল্পী স্কুলের বিরতির সময় কলিগদের সাথে চা খাচ্ছে এমন সময় পাশের বাড়ির ফরিদ এসে বলে ভাবী রাজিব ভাই অসুস্হ হয়ে মেরিল্যান্ড” হাসপাতালে আছেন আপনি তাড়াতাড়ি যান।মূহুর্তেই বেরিয়ে পড়ে আর যাবার সময় ভাবছে কি হলো শারীরিক কোন অসুখতো নেই ওর।হাসপাতালের ওয়ার্ডের দিকে অগ্রসর হতেই দেখে পুরো ওয়ার্ড ঘিরে রেখেছে ডজন খানেক পুলিশ,কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছেনা।শিল্পীর পরিচয় শুনে ভিতরে যেতে দেয় আর এই সময়ে রক্তাক্ত অবস্হায় রাজিবকে স্ট্রেচারে নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকছে একদল ডাক্তার।রাজিব শিল্পীকে কি যেন বলতে চাচ্ছে হাত নাড়ায়ে কিন্তু শিল্পী স্ট্রেচারের নাগাল পেলো না দ্রুত গতিতে চলছে সামনের দিকে।তখনো কিছু জানেনা শিল্পী কি ঘটেছে,হাত ধরতে না পেরে হাহুতাস করতে দেখে একজন জুনিয়র ডাক্তার শান্তনা দিয়ে বললেন বেশী সময় লাগবেনা আপনি চিন্তা করবেন না ম্যাডাম,তেমন সিরিয়াস কিছুনা।

মিনিট দশেক পরে পুলিশ ইনস্পেকটর এসে কূশলাদি বিনিময় করে জানালেন সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত অবস্হায় এখানে আনা হয়েছে তবে মোটিভ এখন জানা যায়নি।

দীর্ঘ চার ঘন্টা অপারেশনের পর ডাক্তার এসে বললেন সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে তিনি মারা গেছেন।শিল্পী মুর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলো কিছুই বললো না আর ছেলেরা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।অল্প কিছুক্ষন পরেই রাজিবের মরদেহ এসে হাজির শিল্পীর সামনে,শিল্পী রাজিবের উপরেই পড়ে গেলো,কে তাকে সামলাবে আজ,মাত্র আশিদিনের সুখের সংসার।

অনেক কাঁন্নাকাটি করে নিজেকে সামলিয়ে শশুড়কে জানালো রাজিব মারা গেছে,কেন কেমনে কোনকিছুর উত্তর দিতে পারেনি শিল্পী অনবরত কাঁদছে ছেলেদের জড়িয়ে।সুখ যেন শিল্পীর কপালে নেই।
পরেরদিন সকালে জানাজা শেষে দাফন শেষ হলো সেইসাথে শিল্পীর রঙ্গিন জীবনের অবসান,সাদা শাড়িতে নিজেকে মানিয়ে নিলো।রাজিবের মৃত্যুর পর জমির দলিলটা কোথাও খুঁজে মিললো না,সমস্ত বাড়ি তন্নতন্ন করেও কোন হাদিস নেই এমনকি জায়গাটি কোথায় ছিলো তাও জানা নেই।

শিল্পীর বাবা প্রায় তিন বছর পর খবর শুনলেন রাজিব মারা গেছে,এদিকের শিল্পীর সব ভাইবোন বিয়ে করে নিজস্ব ভুবনে চলছে ওর সাথে কারো যোগাযোগ নেই।ওরা কেউ আর বাবা মায়ের সাথে থাকেনা।খবর শুনার পর বাপের হৃদয়ে মোঁচড় দিতে লাগলো মেয়ের জন্য কেমন ব্যাকুল হয়ে উঠেন,সপ্তাহদিন পরে সস্ত্রীক দেশে এসে সোজা চলে গেলেন ঐ এলাকাতে।অনেক খোঁজাখুজির পর বাসা বের করে উপস্হিত হন,ড্রয়িং রুমে কয়েকটা ছেলে দেখে জিজ্ঞেস করেন এটা কি শিল্পীর বাসা?ছেলে জি বলেই দাদাকে ডাকলে দাদা এসে বলেন কাকে চাচ্ছেন?শিল্পীকে চাচ্ছিলাম আমরা শিল্পীর বাবা মা।শুনেই জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন বৌমা বৌমা দ্যাখো কে এসেছেন.!শিল্পী চিল্লাচিল্লি শুনে দৌঁড়ে আসছে আর বলছে কি হয়েছে বাবা?এসো এসো দ্যাখো কে এসেছেন..!
রুমেই এসে নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো,এ যেন বর্ষার কোন বাঁধ ভাঙ্গা নদীর স্রোত বইছে,দীর্ঘ ষোল বছর পর বাবার বুকে মাথা রেখে পরম শান্তি পেলো শিল্পী।

মেয়ের কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর কারণ ছিলো নাতীসহ আমেরিকায়ে নিয়ে যাবেন কিন্তু শিল্পী কোন অবস্হাতেই বৃদ্ধ শশুড় শাশুড়িকে রেখে যাবেনা,যাদের ছায়ায় এতদিন ছিলো সেই মানুষদের ফেলে যাওয়া সম্ভব না জানিয়ে দিলো বাবা মাকে।শশুড় শাশুড়িও অনেক বুঝালেন বৌ’মা আমরা আর কদিন আছি তুমি ও বাচ্চাদের ভবিষ্যত চিন্তা করে চলে যাও,এভাবে কতদিন চাকুরী করে চলবে,ওখানে সুন্দর ভবিষ্যত কিন্তু সে তার সিদ্ধান্তে অনড়।এই অমানবিক কাজ শিল্পীর সম্ভব না।দশদিন পর বাবা মা অসন্তুষ্ট চিত্তে চলে গেলেন আমেরিকায়,শিল্পীর ভাবনা আর কি দেখা হবে জীবদ্দশায়.!

নাহ্ সত্যি আর দেখা হলোনা,বাবা আমেরিকাতে ফিরে অল্পদিন পরেই হার্টএ্যাটাকে বিদায় নিলেন,মা আরো বছর খানেক ছিলেন তারপর তিনিও পরপারে চলে গেলেন।বাবা মায়ের বিদায়টা তাকে আরো মানষিকভাবে দূর্বল করে দেয় কিন্তু বেঁচে থাকার সংগ্রামতো চালাতে হবে।

ছেলেরাও কলেজ ভার্সিটিতে চলে গেলো তাদের নিজস্ব একটা জগত পেলো,মা শুধু শশুড় শাশুড়িদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন তবে মন্দ না।একদিন সকালে শাশুড়ির জ্বর হলে ডাক্তারের পরামর্শে হাসপাতালে ভর্তি কিন্তু বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।কাঁন্নায় ভেঙ্গে পড়ে শিল্পী এ যেন শাশুড়ি নয় নিজের মা হারালো,মা’য়ের মত ছায়াগাছটা যেন সরে গেলো মাথার উপর থেকে।শশুড় বাবাও নয়মাসের মাথায় বিদায় নিলেন পরপারে,শেষ কথাটি ছিলো “মা’রে অনেক কষ্ট করেছিস আমাদের জন্য ক্ষমা করিস” বলেই চোঁখ দুটো চিরদিনের জন্য বন্ধ করে নিলেন।

এতো বড় বাড়িতে ভাড়া দিয়ে পুষিয়ে উঠতে না পারায় ছোট্ট বাড়ি অপেক্ষকৃত সস্তা এলাকা বেছে নিল।সবকিছু গোছানোর সময় সেই হারিয়ে যাওয়া দলিলটার সন্ধান মেলে,ধূলোয় ছেয়ে গেছে কিছুটা উঁইপোঁকায় ধরেছে,শাড়ির আঁচলে মুছে নিলো স্বামীর ভালোবাসার স্বাক্ষরটি।পাতা উল্টাতেই অশ্রুবারিষ হতে লাগলো,যে মানুষের ভালোবাসাকে পূঁজি করে বেঁচেছিলো আজ কেমনে ঘৃণা করবে,সেতো আর নেই।আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে তুমি তাঁর গোনাহ মাফ করে জান্নাতের বাসিন্দা করে নিও,আমি মনে প্রাণে ক্ষমা করে দিলাম।

দলিলের কিছু অংশ ছিলো:>

আমি শিল্পী দেওয়ান ভালোবেসে কোর্টের মাধ্যমে রাজিব দেওয়ানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হই,আমাদের দুটো সন্তান।রাজিব দেওয়ানের অনৈতিক ও অশালীন কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত ও আমাদের নিজস্ব স্বাধীনতার জন্য সুস্হ স্বাভাবিক জ্ঞান বুদ্ধিতে আমরা দুজন হাজির হয়ে আমি নিম্ন স্বাক্ষরকারি শিল্পী দেওয়ান আমার স্বামীকে ডিভোর্স দিলাম।আজ হতে আমরা স্বামী স্ত্রী হিসেবে আর নই এমতাবস্থায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা নেয়া হোক।

স্বাক্ষর
শিল্পী দেওয়ান।

আমি রাজিব দেওয়ান এইমর্মে প্রত্যায়ণ করছি যে শিল্পী দেওয়ানের মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলাম এবং আমার কোন আপত্তি নেই,এখন থেকে আমরা পরষ্পরের কাছে দায়বদ্ধ নই এবং নতুন সংসার গড়তে কারো কোন দাবি নেই।

স্বাক্ষর
রাজিব দেওয়ান।

Show More
Back to top button
Close
Close