বাংলাদেশরাজনীতি

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী মোহাম্মদ নাসিম (১৯৪৮-২০২০)

মোঃ রুহুল আমীন ;মোহাম্মদ নাসিম ১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলায় জাতীয় নেতা এম মনসুর আলী ও মা মোসাম্মাৎ আমেনা মনসুরের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এম মনসুর আলী স্বাধীনতা পরবর্তী বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মোহাম্মদ নাসিম জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। গত শতকের ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় নেতা মোহাম্মদ নাসিম স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া যুবলীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর ৩রা নভেম্বর কারাগারে ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকেও হত্যা করা হয়। বাবা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর মৃত্যুর পর থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন মোহাম্মদ নাসিম। তখন তাঁকে কারাগারেও যেতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর দীর্ঘ ২১টি বছর সামরিক ও খালেদা জিয়া বিরোধী আন্দোলনে রাজপথের সাহসী যোদ্ধা ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। এ কারণে রাজপথে তাঁকে বারবার নির্যাতনের শিকার হতে হয়, কারাগারেও যেতে হয় বারংবার। ১৯৮৬ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিম। তখন সংসদে বিরোধীদলীয় হুইপের দায়িত্ব পান তিনি। তখন তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক। এরপর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে সারাদেশে সংগঠনকে গড়ে তোলার দায়িত্বও পালন করেন তিনি। ১৯৯১ সালের সংসদে বিরোধী দলের প্রধান হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিম।
এরপর ১৯৯৬, ২০০১, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোহাম্মদ নাসিম। এর মধ্যে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে মোহাম্মদ নাসিম দুটি করে আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময়ে মোহাম্মদ নাসিমকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরের বছরের মার্চে তাঁকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর ১৯৯৯ সালে মন্ত্রিসভায় রদবদলে মোহাম্মদ নাসিম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
ওয়ান-ইলেভেনের সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রথমেই রাজপথের সাহসী যোদ্ধা মোহাম্মদ নাসিমকে গ্রেফতার করে নির্যাতন করে। কারাগারে থাকা অবস্থাতেই প্রথম দফায় স্ট্রোক করেন এবং বাম সাইড অবশ হয়ে যায় তাঁর। ২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলেও সেবার আইনি জটিলতার কারণে নির্বাচন করতে পারেননি মোহাম্মদ নাসিম। তাঁর আসনে বিজয়ী হন তাঁর বড় ছেলে প্রকৌশলী তানভীর শাকিল জয়। তবে পরের মেয়াদে ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসলে মোহাম্মদ নাসিমকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সবশেষ ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও মোহাম্মদ নাসিম সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি জাতীয় সংসদে খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পারিবারিক জীবনে মোহাম্মদ নাসিম বিবাহিত ও তিন সন্তানের জনক। তাঁর স্ত্রীর নাম লায়লা আরজুমান্দ। রাজনীতির পাশাপাশি সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। ঢাকাসহ নিজ এলাকা সিরাজগঞ্জে বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ছাড়াও মোহাম্মদ নাসিম নির্বাচনী জোট কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র হিসেবে আমৃত্যু নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।গত শনিবার ১৩ জুন সকাল ১১ টা ১০ মিনিটের সময় বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭২ বছর বয়সে মোহাম্মদ নাসিম মৃত্যুবরণ করেন।

Show More

Related Articles

Back to top button
Close
Close