বাংলাদেশ

কোভিড-১৯ এর মধ্যেও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্জন

মোঃ রুহুল আমীন নিজস্ব প্রতিনিধি ; বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফের রেকর্ড ভেঙ্গে ৩৫ বিলিয়ন (৩ হাজার ৫০৯ কোটি) মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। দেশের ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ রিজার্ভ। এ নিয়ে এক মাসের মধ্যেই দুইবার রেকর্ড হলো রিজার্ভের। এর আগে গত ৩ জুন মাসে প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ছিল ৩৪ বিলিয়ন ডলারের গড় অতিক্রম করে। প্রতি মাসে ৪ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় হিসাবে এই রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে আট মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো হয়। আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, একটি দেশের অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ থাকতে হয়। প্রতিমাসে ৪ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয়ের খরচ হিসেবে হাতে থাকা রিজার্ভ দিয়ে বর্তমানে সাড়ে আট মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান রিজার্ভ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে। রিজার্ভের দিক দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরেই বাংলাদেশের স্থান। যা পাকিস্তানের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে গত চার মাসে রফতানি নেমে গেছে নিম্নে, সেই সাথে আমদানিও কমেছে। কোভিড-১৯ এর প্রভাবের মধ্যেও সুসংবাদ দিচ্ছেন বাঙালি প্রবাসীরা। করোনা সঙ্কটের মধ্যেও বৈধ পথে প্রচুর রেমিটেন্স বাংলাদেশে আসছে। চলতি মাসের ১৮ জুন পর্যন্ত প্রবাসী বাংলাদেশীরা ১২০ কোটি ৮০ লাখ ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। আগের বছরের পুরো জুন মাসে রেমিটেন্স এসেছিল ১৩৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার। সুতরাং আগের বছরের একই মাসের তুলনায় চলতি জুনে রেমিটেন্স বাড়বে। এভাবে রেমিটেন্স বাড়লেও আমদানি দায় পরিশোধের তেমন চাপ থাকছে না। যে কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রচুর ডলার কিনতে হচ্ছে। মঙ্গলবারও কয়েকটি ব্যাংক থেকে ১০ কোটি ডলার ক্রয় হয়। এছাড়াও বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি থেকে প্রচুর ঋণ আসছে। যে কারণে রিজার্ভে একের পর এক রেকর্ড হচ্ছে। বুধবার বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত রিজার্ভের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক শূন্য ৯ বিলিয়ন ডলার বা তিন হাজার ৫০৯ কোটি ডলার। এর আগে গত জুন মাসের ৩ তারিখ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে। জুন মাস শেষ হওয়ার আগেই রিজার্ভ বাড়ল আরও এক বিলিয়ন ডলার। তারও আগে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ রেকর্ড ৩৩ বিলিয়ন ডলার উচ্চতায় ওঠে ২০১৭ সালের জুন মাসে ২১ তারিখ। সেইদিন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ৩০১ কোটি ডলার। এরপর কিছুটা কমলেও ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর, ২ নবেম্বর ও ২৮ ডিসেম্বর আবার ৩৩ বিলিয়ন ডলারে ফিরে।

এদিকে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিছু বিদেশী ঋণ ও অনুদানও। আমদানি ব্যয় কমে যাওয়ায় রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোঃ সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন, একইসঙ্গে বিদেশী ঋণ ও অনুদান আসছে। আমদানি ব্যয় হ্রাস পাওয়ায় দেশের রিজার্ভের পরিমাণ বেড়েছে। তবে রফতানি আয় বাড়ানো সম্ভব না হলে রিজার্ভের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে। জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ সিপিডি’র অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সহায়তার কারণেই এই দুর্যোগকালেও রিজার্ভে রেকর্ড হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংকিং খাত থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। না হলে ব্যাংকগুলো সঙ্কট কাটিয়ে সঠিকপথে ফিরতে পারবে না। বাংলাদেশকে দুই মাস পরপর পরিশোধ করতে হয় আকুর বিল। প্রতি মাসে ৪ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয়ের খরচ হিসেবে হাতে থাকা রিজার্ভ দিয়ে বর্তমানে সাড়ে আট মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস পর্যন্ত প্রবাসীরা মোট ১ হাজার ৬৩৬ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। আগের বছরের একই সময় পর্যন্ত এসেছিল এক হাজার ৫০৫ কোটি ডলার। এ হিসেবে মে পর্যন্ত রেমিটেন্স বেশি আছে ১৩১ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ। গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত টানা তিন মাস রেমিটেন্স কমার পরও এ হারে প্রবৃদ্ধি আছে। করোনা ভাইরাসের প্রভাব শুরুর পূর্বে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অবশ্যই রেমিটেন্সে প্রবৃদ্ধি ছিল ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। রেমিটেন্সে প্রবৃদ্ধি থাকলেও রফতানির পাশাপাশি আমদানি দায় পরিশোধও একেবারে কমেছে। যে কারণে রিজার্ভ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের মে পর্যন্ত রফতানি আয় দেশে এসেছে তিন হাজার ৯৬ কোটি ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ১৮ শতাংশ কম। এর মধ্যে মে মাসে রফতানি কমেছে ৬১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আর গত এপ্রিলে কমেছিল ৮৩ শতাংশ। গত এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৪ হাজার ৬৪৪ কোটি ডলারের পণ্য। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ কম।

Show More

Related Articles

Back to top button
Close
Close