খেলার খবর

কিংবদন্তীর মৃত্যু নেই, হয় শুধু বিদায়…

সাইফ আল হাদিঃ

প্রতিপক্ষের কোন পার্টনারশিপ যখন বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, তখনই অধিনায়কের কাছে দলের টার্নিং পয়েন্ট ছিলেন তিনি। তাই বলে কি অধিনায়ককে নিরাশ করার পাত্র তিনি। বেশিরভাগ সময়ই অধিনায়কদের নিরাশ করেননি তিনি। তাঁর করা লেগ স্পিনে অধিনায়কের কপাল থেকে দুশ্চিন্তার ভাঁজ সরিয়ে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠেছে। দলে অনেক জুনিয়রের অধিনায়কত্বেও খেলতে হয়েছে তাকে। কিন্তু ক্যাপ্টেনদের প্রতি আস্থা, আর শ্রদ্ধাবোধে ঘাটতি ছিল না তার। তাই জীবনের ইনিংসে প্রায় ডেথ ওভারে পৌঁছেও আবেগ জড়ানো গলায় রামচাঁদ গোয়ালা বলতে পারতেন ‘মাই ক্যাপ্টেন’!

হ্যাঁ, বলছিলাম বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম বাঁ-হাতি স্পিনার রামচাঁদ গোয়ালার কথা। ফ্ল্যাশব্যাকে স্মৃতির ফ্রেম মেলে ধরলে দেখা যাবে মণিমানিক্যর কমতি নেই কিন্তু স্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া এক নামে পরিনত হয়েছে রামচাঁদ গোয়ালার নাম।

ময়মনসিংহের ব্রাহ্মপল্লিতে পৈত্রিক বাড়ির জীর্ণ দেয়ালে নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের কিছু প্রাপ্তির ছবি আর স্মৃতি নিয়ে বর্তমানে মলিন জীবন কাটাচ্ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম বাঁহাতি স্পিনার রামচাঁদ গোয়ালা। ঘরের চারপাশে গুছিয়ে রাখা নিজের খেলোয়াড়ি জীবনে প্রাপ্ত ট্রফিগুলো আর দেয়ালে টানানো ছবিতে জমে ছিল ধুলার পাহাড়। বাসায় নেই যত্ন নেবার কোন মানুষ। কারণ, পরিবার বলতে তিনি মনে করতেন ক্রিকেটের বাইশ গজ আর নিজের ক্লাবকে। ক্রিকেটকে ভালোবেসে, ক্রিকেটের মোহে থেকে বিয়ের কথাই ভুলে গিয়েছিলেন যে তিনি।

“এই খেলার পিছনে গিয়েই আমি আর বিয়ের সময় খুঁজে পাই নাই। শেষের দিকে এসে আমি তো ওল্ড, বয়স হয়ে গেছে তাই আর বিয়ে করিনি।” নিজের বিয়ে না কারার কারণটা এভাবেই জানিয়েছিলেন ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলে রেকর্ড গড়া এই ক্রিকেটার।

ক্রিকেটের বাইশ গজে পা রেখেছিলেন ১৯৫২ সালে ১২ বছর বয়সে। শুরুটা হয়েছিল কোচ ফখরুদ্দিনের অধীনে পন্ডিতপাড়া এসি’র হয়ে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের শুরুটা ১৯৬২ সালে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ছয়বারের সর্ব্বোচ্চ উইকেট শিকারী তিনি। নিজের ক্যারিয়ার সেরা বোলিং স্পেল হলো ৮/২৫। ঢাকা আবাহনী ক্লাবে দীর্ঘ পনেরো বছর খেলেছেন রামচাঁদ গোয়ালা। একসময় তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন ‘আবাহনীর গোয়ালা’

‘আবাহনীর গোয়ালা’ বর্তমান সময়ে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের মাঝে নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলেন। এ বিষয়ে কথা বলতে যেয়ে একবার জানিয়েছিলেন, ‘বর্তমান সময়ে সাকিব আল হাসানকে খুব ভালো লাগে। খুবই ভালো লাগে। ওর আর আমার বোলিং স্টাইল প্রায় একইরকম। তবে আমার বোলিংয়ের বাইট অন্যরকম ছিল। ওর ভিতরে যথেষ্ট প্রতিভা আছে।’

১৯৮৬ সালে রামচাঁদ গোয়ালা খেলেছেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলে। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে যখন তিনি কব্জির খেলা দেখিয়েছেন বাংলাদেশ তখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলে নি। তবে এ নিয়ে কোন আক্ষেপ নেই তার। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে রেকর্ড গড়ে ৫৩ বছর বয়স পর্যন্ত বাইশ গজে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। অতঃপর ক্রিকেটকে শুভবিদায় বলেছেন ১৯৯৩ সালে।

দেশের প্রথম এই বাঁ-হাতি স্পিনারের কপালে এখনো জুটেনি জাতীয় ক্রীড়া পুরষ্কার। এখনো বিসিবি থেকে কোন সম্মাননা বা অর্থ পুরষ্কার পাননি দেশের বাঁ-হাতি স্পিনের এই জাদুকর। প্রাপ্তির খাতায় বড় অর্জন বলতে বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এটিই এ পর্যন্ত তার কাছে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।

খেলোয়াড়ি জীবনের শেষে কিছুদিন কোচিংয়ের সাথে যুক্ত ছিলেন সবার প্রিয় ‘গোয়ালা দা’। বাংলাদেশ জাতীয় দলের টেস্ট অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ছিলেন তারই অনুগত ছাত্র। বার্ধক্যজনিত রোগে ভোগে আজ ৮১ বছর বয়সে ময়মনসিংহের নিজ বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন সবার পছন্দের ‘গোয়ালা দা’।

অহ গোয়ালা দা!

Show More

Related Articles

Back to top button
Close
Close