রাজনীতিবাংলাদেশ

আজ ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস,বাঙালির মুক্তির সনদ ;

আজ-কাল ডেস্ক ; প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ রবিবার (৭ জুন) দেশে ঐতিহাসিক ছয়দফা দিবস পালন উপলক্ষে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। নিবন্ধটি নীচে তুলে ধরা হলো: আমরা ৭ জুন ৬-দফা দিবস হিসেবে পালন করি। ২০২০ সালে বাঙালির জীবনে এক অনন্য বছর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগণের জন্য এ বছরটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের ব্যাপক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী প্রবাসী বাঙালিরাও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ইউনেস্কো এ দিবসটি উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলিও প্রস্তুতি নিয়েছিল। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে একটি স্মারক ডাক টিকিট প্রকাশ করেছে।

যখন এমন ব্যাপক আয়োজন চলছে, তখনই বিশ্বব্যাপী এক মহামারি দেখা দিল। করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নামক এক সংক্রামক ব্যাধি বিশ্ববাসীকে এমনভাবে সংক্রমিত করছে যে, বিশ্বের প্রায়সকল দেশই এর দ্বারা আক্রান্ত এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক – সকল কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশও এ ভাইরাস থেকে মুক্ত নয়। এমতাবস্থায়, আমরা জনস্বার্থে সকল কার্যক্রম বিশেষ করে যেখানে জনসমাগম হতে পারে, সে ধরনের কর্মসূচি বাতিল করে দিয়ে কেবল রেডিও, টেলিভিশন বা ডিজিটাল মাধ্যমে কর্মসূচি পালন করছি।১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি তাসখন্ড চুক্তিকে কেন্দ্র করে ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারী লাহোরে বিরোধী দলসমূহের এক জাতীয় সম্মেলনে আহবান করা হয়।৬ ফেব্রুয়ারী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করেন, যা বাঙালি জাতির স্বাধীনতা বা মুক্তির সনদ হিসেবে পরিচিতি।
বঙ্গবন্ধুর ৬ দফাগুলো নিম্নরূপঃ
প্রথম দফাঃ শাসনতন্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি; ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা করে পাকিস্তানের সত্যিকার যুক্তরাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। এ যুক্তরাষ্ট্রের সরকার হবে পার্লামেন্ট পদ্ধতির।প্রদেশগুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। পাকিস্তানের আইন পরিষদ হবে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদগুলো গঠিত হবে সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের মাধ্যমে।
দ্বিতীয় দফাঃ কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা ; কেন্দ্রীয় বা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের হাতে কেবলমাত্র দেশরক্ষা এবং পররাষ্ট্র এ দুটি বিষয়ে ক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকবে।অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।
তৃতীয় দফাঃ মুদ্রা ও অর্থ বিষয়ক ক্ষমতা ; মুদ্রা ও অর্থ সংক্রান্ত ক্ষমতার ক্ষেত্রে দুটি বিকল্প প্রস্তাব করা হয়।এ দুটি প্রস্তাবের মধ্য থেকে যে কোন একটিকে আগ্রহ করা যেতে পারে।প্রস্তাব দুটি নিম্নরূপঃ (ক) পৃথক মুদ্রা ব্যবস্তা; পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক, অথচ সহজ বক অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে।এ ক্ষেত্রে দু অঞ্চলের জন্য স্বতন্ত্র বা পৃথক স্টেট ব্যাংক থাকবে এবং মুদ্রার পরিচালনা ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে।অথবা, (খ) একই মুদ্রা ব্যবস্তা ; দেশের দু অঞ্চলের জন্য একই মুদ্রার ব্যবস্তা থাকবে।তবে সংবিধানে এমন ব্যবস্তা রাখতে হবে যে,যাতে করে এক অঞ্চলের মুদ্রা অন্য অঞ্চলে পাচার হতে না পারে। বিশেষ করে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচার বন্ধ করার জন্য সংবিধানে কার্যকর ব্যবস্তা রাখতে হবে।এ ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভের ব্যবস্তাসহ পৃথক অর্থ বিষয়ক নীতি প্রবর্তন করতে হবে।
চতুর্থ দফাঃ রাজস্ব কর ও শুল্ক বিষয়ক ক্ষমতা ; সকল প্রকার ট্যাক্স, খাজনা ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। কেন্দ্রীয় সরকারের এ ব্যাপারে কোন ক্ষমতা থাকবে না।তবে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য আঞ্চলিক সরকারের আদায়কৃত রাজস্বের অংশ ফেডারেল তহবিলে জমা হবে।
পঞ্চম দফাঃ বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা ; পঞ্চম দফায় বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ে নিম্নরুপ সাংবিধানিক বিধানের সুপারিশ করা হয়ঃ
(ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রত্যেকটি অঙ্গরাজ্যের বর্হিবাণিজ্যের পৃথক পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে।
(খ) বর্হিবাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গরাজ্যগুলোর এখতিয়ারে থাকবে এবং অঙ্গরাজ্যেগুলোর প্রয়োজনে অঙ্গরাজ্যেগুলো কর্তৃক ব্যবহৃত হবে।
(গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেহী মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত নির্দিষ্ট হারে অঙ্গরাজ্যগুলো মিটাবে।
(ঘ) অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে দেশজ দ্রব্য চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক বা করজাতীয় কোনরুপ বাধানিষেধ থাকবে না।
(ঙ) সংবিধানে অঙ্গরাজ্যগুলোকে বিদেশে নিজ নিজ অঙ্গরাজ্যের বাণিজ্য প্রতিনিধি দল প্রেরণের এবং স্ব স্ব স্বার্থে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।
ষষ্ঠ দফাঃ আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা ; এ দফায় নিম্নলিখিত দাবিসমূহ পেশ করা হয়ঃ
(ক) আঞ্চলিক সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সংবিধানে অঙ্গরাজ্যগুলোকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা-সাময়িক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে।
(খ) কেন্দ্রীয় সরকারের সকল শাখায় বা চাকরি ক্ষেত্রে প্রতিটি ইউনিট থেকে জনসংখ্যার ভিত্তিতে লোক নিয়োগ করতে হবে।
(গ) নৌবাহিনীর সদর দপ্তর করাচি থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করতে হবে।
সুতরাং দেখা যায় যে, ১৯৬৬ সালের ছয়-দফা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ।

Tags
Show More

Related Articles

Back to top button
Close
Close